“মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান ।”
না ! আমরা কাশীরাম দাস নই! কিন্তু মহাকাব্য মহাভারত যেন অনন্ত রহস্যের খনি। তাই সেই খনি থেকেই মনি-মুক্ত আপনাদের জন্য কুড়িয়ে আনতে আমাদের নতুন প্রয়াস “পুরাণের ফুরানো কথা” সিরিজ। প্রথম পর্ব শুরু করা যাক স্বয়ং মহাভারত রচনাকারী বেদব্যাসকে নিয়েই।
ব্যাসদেবের জন্মবৃত্তান্ত বেশ রহস্যময় । আজ রইল সেই গল্প।
কল্মাষপাদ নামে এক ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা ছিলেন। একদিন তিনি হরিণ শিকারে বেড়িয়ে একটি সরু পথের মধ্যে প্রবেশ করলেন । সেই সময় সেই পথেই বশিষ্ঠ মুনির বড় ছেলে শক্তৃ আসছিলেন। রাজা তাকে পথ ছেড়ে দিতে বললেন । কিন্তু শক্তৃ বললেন, ব্রাহ্মণকে পথ ছেড়ে দেওয়াই রাজার ধর্ম। এই কথা শুনে রাজা শক্তৃর মাথায় কশাঘাত করে বসলেন । শক্তৃ রেগে গিয়ে রাজাকে অভিশাপ দিলেন নরমাংসভােজী রাক্ষসে পরিনত হওয়ার। এরপর কল্মাষপাদ রাক্ষসে পরিণত হয়ে, শক্তৃকেই ভক্ষণ করে বসলেন । অবশ্য এইসব চক্রান্তের পিছনে ছিলেন বিশ্বামিত্র। সে এক অন্য কাহিনী । বশিষ্ঠের সঙ্গে বিশ্বামিত্রের দ্বন্দ্ব ছিল বহু পুরোনো। শুধু শক্তৃ নয়, কল্মাষপাদ বশিষ্ঠের একশত পুত্রকেই ভক্ষণ করে ফেললেন । শক্তৃ যখন মারা যান তাঁর স্ত্রী অদৃশ্যন্তী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। কালক্রমে অদৃশ্যন্তী যে পুত্র-সন্তানের জন্ম দেন, তিনিই হলেন পরাশর । জন্মের পর থেকে মাতা অদৃশ্যন্তী এবং পিতামহ ঋষি বশিষ্ঠ দেবের রক্ষণাবেক্ষণে পরাশর ক্রমে মহাপন্ডিত হয়ে উঠলেন।
এদিকে পুরুবংশজাত উপরিচর বসু চেদি দেশের রাজা ছিলেন। তাঁর পত্নীর নাম গিরিকা। গিরিকা ছিলেন কোলাহল পর্বত ও শুক্তিমতী নদীর কন্যা। একবার মৃগয়ায় গিয়ে পত্নীকে স্মরণ করে উপরিচর বসুর শুক্রস্খলন হয়। সেই স্খলিত শুক্র এক শ্যেনপক্ষী পত্রপুটে নিয়ে উড়ে যায়। পথে অন্য আর একটি শ্যেনপক্ষীর আক্রমণে শুক্র যমুনার জলে পতিত হয়। যমুনার জলে বাস করত এক মৎসী। সে ছিল ব্রহ্মশাপগ্রস্থ অপ্সরা অদ্রিকা। সেই শুক্রে অদ্রিকা গর্ভবতী হয়। দশম মাসে ওই মৎস্যরূপী অপ্সরা ধীবরের জালে ধরা পড়ার পর তার পেট চিরে একটি পুত্র ও একটি কন্যা পাওয়া যায় । পুত্রটিকে রাজা নিয়ে চলে যায় । কন্যাটি রয়ে যায় ধীবরের কাছেই ।
সেই কন্যা মৎস্যজীবীদের সঙ্গে বাস করত বলে তার নাম হয় মৎস্যগন্ধা। পরমাসুন্দরী কন্যাটি যমুনা নদীতে খেয়া পারাপার করত ও পারানির কড়ি নিত। একদিন তীর্থ পর্যটন করতে করতে মৎস্যগন্ধার কাছে উপস্থিত হলেন পরাশর। তিনি জিগ্যেস করলেন, এই নৌকার কাণ্ডারী কোথায়? মৎস্যগন্ধা জবাব দিল, ধীবরের পুত্র না থাকায় আমিই সকলকে পারাপার করি। পরাশর নৌকায় উঠে বসলেন।
কিছুটা দূর যাওয়ার পর পরাশর মুনি বললেন মাতা আপনার নৌকায় মাছের গন্ধ কেন? তখন মৎস্যগন্ধা লজ্জিত হয়ে বললেন মুনিবর মাছের গন্ধ আমার শরীর থেকে আসছে। পরাশর জিজ্ঞাসা করলো, কিভাবে? মৎস্যগন্ধা বললেন , আমার জন্ম হয়েছিল মাছের ভেতরে । তাই জন্মলগ্ন থেকেই আমার শরীর থেকে মাছের গন্ধ আসে । পরাশর মুনি বললেন মাতা আপনি নদী পারাপারে আমাকে সহায়তা করেছেন, আপনি যদি চান আপনার এই উপকারের ফলস্বরূপ আমি আপনার মাছের গন্ধ আমার যোগ তপস্যা শক্তি তেজর্ভূষী (তেজর্ভূষী বলতে ধোঁয়া সংস্কৃত ভাষায় ধোঁয়া অর্থ ভূষী) দ্বারা দূর করতে পারি। মৎস্যগন্ধা তখন বললেন, আমি আপনার নিকট কৃতজ্ঞ হবো।
পরাশর মুনি বললেন, কিন্তু আপনি আমার তেজর্ভূষী ধারন করতে পারবেন না । এর তেজে আপনার কোলে এক পুত্র সন্তানের আবির্ভাব হবে । তখন মৎস্যগন্ধা বলেন, হে মহর্ষি এ কি করে সম্ভব ! আমি একজন কুমারী মেয়ে। পরাশর মুনি বললেন, আমি আপনাকে বর দিচ্ছি, এতে আপনার কুমারীত্বের কোনও ক্ষতি হবে না। মৎস্যগন্ধা তখন আর চিন্তা না করে সম্মত হলো।
তারপর পরাশর মুনি মৎস্যগন্ধাকে যমুনার মধ্যবর্তী একটি নির্জন দ্বীপে নৌকা নিয়ে যেতে বললেন । মুনি তপস্যা শক্তি দিয়ে তেজর্ভূষী তৈরি করলেন । পরাশর মুনির কল্যাণে ঐ কন্যার গায়ের মৎস্যগন্ধ আশ্চর্যজনকভাবে পদ্মসুবাসে পরিনত হল । তখন তাঁর নাম হলো পদ্মগন্ধা।
কিন্তু পদ্মগন্ধার কোলে পরাশর মুনির কথা মত এক পুত্রসন্তানের জন্ম হল । তাঁর জন্মক্ষণে কেউ শঙ্খধ্বনি , উলুধ্বনি দেয়নি । তিনি ছিলেন কুৎসিত, কৃষ্ণকায় । তখন পরাশর ঐ পুত্রের নাম রাখেন কৃষ্ণ। যমুনার মধ্যবর্তী এক দ্বীপে জন্মগ্রহন করেছেন ব’লে তাঁর অপর পরিচয় হলো ‘দ্বৈপায়ণ’।
মৎস্যগন্ধা ঐ পুত্রসন্তানকে নিয়ে ধীবর রাজগৃহে চলে যায়। পদ্মগন্ধার কোলে নবজাতক দেখে ধীবর প্রশ্ন করলেন পুত্রী তোমার কোলে এই শিশু কোথা থেকে এলো? পদ্মগন্ধা তখন ধীবররাজকে সব বিস্তারিত খুলে বলে। কিন্তু ধীবর রাজ বলেন পুত্রী তুমি কুমারী ! এই শিশু তোমার কাছে থাকলে তোমার বিবাহ অসম্ভব ! তখন পদ্মগন্ধা বলল পিতা আমি আর কি করতে পারি ? ধীবর রাজ বললেন,যার শক্তিতে এই শিশু আবির্ভূত, হয়ত তিনিই কোনও সমাধান দিতে পারবেন ।
অতঃপর ধীবর রাজ ও পদ্মগন্ধা পরাশর মুনির আশ্রমের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আশ্রমে গিয়ে ধীবর রাজ মহর্ষি পরাশরকে সমস্যার কথা বোঝালেন । পদ্মগন্ধা বললেন, হে মহর্ষি আমি নিরুপায় আমার এই সন্তান আমার কাছে থাকলে আমার সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আমার এই পুত্র সন্তানকে আপনার রক্ষণাবেক্ষণেই রাখুন । তাকে আপনার মতো একজন মহর্ষি মহাপন্ডিত হিসেবে গড়ে তুলুন। তখন মহর্ষি পরাশর মুনি সাগ্রহে ওই পুত্র সন্তানকে নিজের কাছে রাখলেন। পুত্র হস্তান্তর করার পর পদ্মগন্ধার নাম হয় সত্যবতী (পরবর্তী কালে হস্তিনারাজ শান্তনু এই সত্যবতীকেই বিয়ে করেছিলেন ) ।
কিন্তু কৃষ্ণদ্বৈপায়ন কিভাবে হয়ে উঠলেন ব্যাসদেব ? কিভাবেই বা রচনা করলেন মহাভারত ? সে গল্প তোলা রইলো দ্বিতীয় পর্বে ।
কলমে – অসিত বরন চক্রবর্তী
সংকলনে – স্বস্তিক মুখার্জি
সহায়তায় – লিলি চক্রবর্তী
