পরীক্ষা দিতে ভীষন ভয়, চ্যাংদোলা করে পরীক্ষা দিতে আনা হয়েছিল স্বয়ং বিদ্যাসাগরকে

করোনার সময় “পরীক্ষা” পড়েছিল চরম পরীক্ষায়। সে আদৌ হবে কি হবে না এই ভেবে ভেবে ছাত্র ছাত্রী থেকে শুরু করে অভিভাবকদেরও “গা ছমছম, কি হয় কি হয়!” ব্যাপার। আমার মত যারা, তাদের তো বেশ মজা ! পরীক্ষা না দিতে পারলেই ভালো।
আহা, পরীক্ষা দিতে ভয় পাই বললেই অমনি ছোট চোখে দেখবেন না! সেতো পরীক্ষা দিতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ও ভয় পেতেন।
কি বিশ্বাস হলো নাতো ? ভাবছেন যত বড়ো মুখ নয় তত বড়ো কথা বলছি ! বেশ বেশ তাহলে শুনুন একটা সত্যি গল্প বলি!
সেবার ঠিক হলো সংস্কৃত কলেজের রচনার পরীক্ষা নেওয়া হবে। নির্ধারিত দিনে ঘড়ির কাঁটায় দশটা বাজতেই যথারীতি শুরু হলো পরীক্ষা। ঘরে ঢুকে পায়চারি করতে শুরু করলেন অধ্যাপক প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ।
বেঁটে খাটো চেহারার পন্ডিত মশাই ঘরে ঢুকেই বুঝতে পারলেন একটি ছাত্র কিন্তু নিরুদ্দেশ।
বিদ্যাসাগর মহাশয় পরীক্ষা দেবার ভয়ে রীতিমত ঘাপটি মেরে বসে আছেন অন্য কোন এক ক্লাসরুমে। পন্ডিত মশাইয়ের প্রিয় ছাত্র তিনি, তার শক্তি থেকে দুর্বলতা পুরোটাই পণ্ডিত মশাইয়ের জানা! তিনি তো আর ছাড়ার পাত্র নন।
এদিক-ওদিক, এই চত্বর, সেই চত্বর পেরিয়ে ঠিক খুঁজে বার করলেন বিদ্যাসাগরকে। কিন্তু বিদ্যাসাগরের জেদও তো কিছু কম ছিলনা! তিনি কিছুতেই রাজি নন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। উপায়ান্তর না দেখে পণ্ডিত মশাই অবশেষে ছুটলেন এক্কেবারে অধ্যক্ষ মার্শাল সাহেবের ঘরে। তারপর ব্যবস্থা করে বিদ্যাসাগরকে প্রায় চ্যাংদোলা করে ক্লাসে নিয়ে এসে বসালেন। ইতিমধ্যে প্রায় ঘণ্টাখানেক পার। কিন্তু তিনি বিদ্যাসাগরকে যেমন করেই হোক পরীক্ষা দেওয়াবেনই।
বিদ্যাসাগরের মুখেতো যারপরনাই বিরক্তি, তিনি শুধু এদিক-ওদিক তাকান, আকাশকুসুম ভাবেন কিন্তু কলমটি তার একদমই চলে না। পন্ডিত মশাই মনে মনে এবার একটু বিরক্তই হলেন বটে। কিন্তু প্রকাশ করলেন না! শুধু একবার বিদ্যাসাগরকে অধ্যক্ষের ভয় দেখালেন মাত্র।
আর কিছু উপায় না দেখে অবশেষে বেচারা বিদ্যাসাগর একটু লেখার চেষ্টা করলেন।
আবার কলম তুলে নিয়ে পণ্ডিত মশাইয়ের দিকে করুন দৃষ্টিতে বললেন “এইটুকু তো সময় বাকি, এর মধ্যে কি আর লিখবো?”
পণ্ডিত মশায় শুধু কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ও কাঁচুমাচু মুখে তাকিয়ে দেখলেন রচনার বিষয় “সত্য কথনের মহিমা” । কিই বা আর করা যায়, সাত পাঁচ ভেবে যা মনে এলো ওই সময়ের মধ্যে লিখেই ফেললেন তিনি।
ফল প্রকাশ পেতেই সকলে অবাক। দেখা গেলো রচনা লেখায় প্রথম হয়েছেন বিদ্যাসাগর, পুরস্কার স্বরূপ পেলেন একশত টাকা। তার থেকেও বড় কথা তার মন থেকে চিরতরে কেটে গেলো পরীক্ষার ভীতি, এক নতুন আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা পেলেন তিনি।
প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ অনেক আগেই টের পেয়েছিলেন বিদ্যাসাগরের প্রতিভার কথা। তাইতো চেষ্টা করতেন কোনরকম জড়তাই যেনো ছাত্রের প্রতিভা বিকাশে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
তবে যে ছেলেটি রচনা লেখার ভয়ে লুকিয়ে থাকতেন, তিনিই যে বাঙালিকে বর্ণ পরিচয় শেখাবেন এমন ঘটনা হয়তো আদতেই গল্প হলেও সত্যি।
আজ প্রয়াণ দিবসে অহর্নিশ এই যুগপুরুষকে জানায় শ্রদ্ধাঞ্জলি।

🖋️ কলমে : © স্বস্তিক মুখার্জী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *