বেশ কয়েক বছর আগের কথা। সময়টা নভেম্বরের মাঝামাঝি। হঠাৎ একদিন খবর আসে পিসেমশাই গুরুতর অসুস্থ। আমার বেশ মনে আছে, ট্রেনের সঠিক কোনো সময় জানা না থাকায় আমরা গাড়ি ভাড়া করে সেই বিকেলেই রওনা দিয়েছিলাম পূর্ব বর্ধমানের দিকে। গন্তব্য সেখানকার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম। আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে প্রায় সাড়ে সাতটা হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু গ্রামের দিকে সন্ধেতেই গভীর রাতের ছবি প্রতিভাত হয়, তাই যাবার সাথে সাথেই পিসির শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরা কাল বিলম্ব না করে সকলের রাতের খাবার ও শোবার ব্যবস্থা করতে লাগলেন। যা হোক কিছু খেয়ে আমরাও সেদিকেই মনোনিবেশ করলাম। বাবা মা বাকি বড়োরা পিসির সাথে বসে আছে। পিসি থেকে থেকেই কিছু একটা বলছে আর মাঝে মাঝে নাক টেনে উঠছে।
শোবার ব্যবস্থা হয়েছিল পিসির বাড়ির দোতলার ঘরে এবং তার ঠিক সামনের প্রতিবেশীর বাড়িতে। আমাদের কয়েকজনের শোবার ব্যবস্থা যেখানে করা হয়েছিল, সেখানে কোনো খাট নেই। মেঝেতে পুরু গদির ঢালাও বিছানা করা হয়েছে। আমি, নটে, রিনি, কালুদার বৌ, ঢ্যাঙা বকুল, তিতির আর ঝন্টিপিসি – আমরা এইক’জন পূর্বদিকের এই বাগানঘেরা ঘরটায় পরপর শুয়ে পড়লাম। বাগান কম। আগাছায় বেশি। সেদিকে তাকাতেই গা টা একটু শিরশির করে উঠলো। কিন্তু কাওকে বলা যাবেনা। এরা নয়তো চেটে প্রেস্টিজ পাংচার করে দেবে। তার চেয়ে এক রাত ভূতেদের কাল্পনিক ভাবনাগুলোকে সহ্য করা ঢের ভালো।
আমাদের ঘরটার পরে ছোট ভাঁড়ার ঘরের মতো কিছু একটা আছে। তার ঠিক পেছনের ঘরটায় পটলা, মেজো কাকা, বিনু দাদা, বড়ো জেঠু আর মনি দাদুদের শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মনি দাদু বেশ মজার মানুষ। মনি দাদুর গল্প আর একটা গল্পে তোমাদের শোনাবো।
এদিকে সমস্যা হয়েছে পটলাকে নিয়ে। পটলা কিছুতেই ওর জন্য নির্দিষ্ট করা রুমে শোবে না। কারণ জানতে চাইলে কি একটা ভাষায় বিড়বিড় করছে। যেটা মোটেই বোধগম্য নয়। শেষমেষ পটলা আমাদের রুমে ঘুমানোর জন্য একটা জোরালো আপিল করেছিল মহিলা ও পুরুষ উভয় কোর্টে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অজ্ঞাত কারণে সেটা বাতিল হয়ে যায়। তারপর সে ধর্নায় বসা, সারারাত না ঘুমিয়ে কাটানো এসব কিছুই করবে বলে ঠিক করে। আমরা কেউ তাতে বাঁধা দিইনি। স্বাধীন দেশের গণতন্ত্র বিঘ্নিত হয়, এমন কোনো কাজ আমরা করিনি। কিন্তু কিছু সময় পেরোতে না পেরোতেই দেখি পটলা চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ে। মনিদাদু জিজ্ঞেস করাতে, সে জানিয়েছিল “বাইরে মশার হাতে কি শেষে প্রাণটা দেবো নাকি!” সবাই একচোট হেসে যে যার নিজের শয়নকক্ষের দিকে পা বাড়ায়।
আমি, রিনি, ঢ্যাঙা বকুল আর তিতির এই চারজন আমরা পরপর শুয়েছিলাম। বেশ অনেক বছর পর দেখা সবার সাথে। ছোটতে দাদার উপনয়নের অনুষ্ঠানে এসেছিলাম একবার। তো টুকটাক কথা বলতে বলতে,
তিতির বলল, “জানিস এ বাড়িতে ভূত আছে।”
সবাই ভয় পেল। কিন্তু হাবভাব এমন যেন, ধুর! ভূত আবার কি! অস্তিত্বহীন মিনিংলেস বিষয় যতো।
তিতির আবার বলে উঠলো, “মা কালীর দিব্যি, ভূত আছে।”
আমি বললাম, “নিজের চোখে দেখেছিস?”
“না নিজের চোখে নয়, তবে তুহিন বলেছে। ও কি আমাকে মিথ্যে বলবে! আগের মাসে টিউশন থেকে ফেরার পথে ও নিজের চোখে দেখেছে। একটা ছায়া মতো হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। ছায়াটা আস্তে আস্তে বড়ো হচ্ছে আকারে…. আমি আর শুনতে পারিনি। নেহাৎ ও খুব সাহসী তাই। নয়তো আমি হলে তো কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারাতাম।”
“আর তুহিনদা তোকে ধরে নিতো একহাতে।” বলেই হাসতে শুরু করলো রিনি।
কিছু সময় পেরোতেই বুঝলাম, তুহিন ছেলেটি তিতিরের বয়ফ্রেন্ড। ক্লাস নাইনে বয়ফ্রেন্ড আছে তিতিরের। আর আমি ইলেভেনে পড়ে একটা স্টেডি ফ্রেণ্ড জোটাতে পারলাম না! ছিঃ! ধিক্ এ জীবন।
“কি রে কি ভাবছিস? ভয় পেয়ে গেলি নাকি! নাকি জামাইবাবুর কথা ভাবছিস? উউমমমমম….” সবাই দেখি আমাকে ধাক্কাধাক্কি করতে করতে নিজেদের ভুলভাল কল্পনা শক্তিকে প্রচণ্ড সজাগ করে তুলেছে। কিন্তু কিছু করার নেই। আমাকে বুকের ব্যথা বুকে চেপে রেখে ভাও খেয়ে যেতে হবে। মাঝে মাঝে লজ্জা পাচ্ছি, এমন অভিনয় করেও দেখাতে হচ্ছে। এ জ্বালা কি যে জ্বালা, বোঝে না আমজনে…. যায় হয়ে যাক, আমার যে বয়ফ্রেন্ড জোটেনি সেকথা ভুলেও মুখে আনা চলবে না। প্রেস্টিজ ম্যাটারস্। হঠাৎ সবাই সমস্বরে বলে উঠলো,
“কি নাম জামাইবাবুর?”
আমি মুখ নামিয়ে জোর জবরদস্তি লজ্জা এনে, মুচকি মুচকি হাসছি আর নাম ভেবেই চলেছি। পৃথিবীতে এতো নাম। আমার মাথায় একটা নাম আসছে না। রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, ঝিঙে,আলু সব নাম মাথায় আসছে অথচ একটা ছেলের নাম মাথায় আসছে না।
“এখন থাক। আগে আমরা দুজনেই একটু স্টেবল হয়ে নিই তারপর বলবো। লোকে বলে, আগে আগে বললে সম্পর্ক ভেঙে যায়।” এসব এক্সপায়ার্ড গাঁজামার্কা উত্তর দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ওরাও বিশাল খবর জোগাড় করতে পেরেছে এই আনন্দে হাঁফ ছাড়লো, সঙ্গে আমাকেও। এরপর সেই গাঁজা সেবন করে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। আমি একটু বেশি গাঁজা খেয়ে ফেলেছিলাম। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। কটা বাজছে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি এসব আর খেয়াল নেই। কিন্তু একটা খসখস শব্দে ঘুমটা পাতলা হয়ে আসে। তারপরও চোখ খুলছি না। কিন্তু আবার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এবার আর চোখ না খুলেও থাকা যাচ্ছে না। চোখ খুললাম। শব্দটা আমাদের ঘরের লাগোয়া একফালি সরু যে বারান্দাটা চলে গেছে সোজা পটলাদের রুমে, সেখান থেকে আসছে। কেউ যেন সেখানে হাঁটছে। ঘনঘন হাঁটছে। থামছে। আবার হাঁটছে। কে এতো রাতে! তাও এই শীতে। গ্রামের দিকে নভেম্বরেও বেশ শীত শীত করে। গায়ের চাদরটা হালকা সরিয়ে উঠতে যাবো, দেখি জানলার পর্দায় ছায়াটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। এবার স্পষ্ট একটা লম্বা পাতলা ছায়া। আমার চোখের সামনে দেখছি। দাঁড়িয়ে আছে। শুধু একটা হাত একবার করে উঠছে আর কিছু সময়ের মধ্যেই নামছে। হাত উঠিয়ে নামিয়ে ঠিক কি করতে চাইছে আত্মাটা? আমাকে টা টা বাই বাই!! কিন্তু আমাকেই কেন? তবে কি আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে! এই ছিল নিয়তি। সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বললাম, বল কি অপরাধ আমার? কেন লিখে দিলে এমন বিধান?? আমার বয়ফ্রেন্ড দরকার নেই ঠাকুর। আর চাইবো না। এবারের মতো ক্ষমা কর। এবার দেখি কিছুক্ষণ হাতটা নামছে না। তবে কি আত্মা আমাকে সিগন্যাল দিচ্ছে! বলতে চাইছে, তাড়াতাড়ি আয়। সময় খুব কম। এবার আমি কাঁদবো। কি দোষ আমার। পিসেমশাইকে দেখতে এসে শেষে আমি টার্গেট হয়ে গেলাম।
হঠাৎ চমকে দেখি ঢ্যাঙা বকুল আমার পাশে উঠে বসে আছে। সেও জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে একটু আনন্দ হল। যাক তবে একা মরবো না। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো ঢ্যাঙা। ও দাঁড়ালে মনে হয় সিলিং ছুঁয়েছে। আমাকে ডাকছে। সাড়া দিতে ইচ্ছে করছিল না। তবুও উঠে দাঁড়ালাম। আমি উঠে দাঁড়ালে মনে হয়, মাটি ফুঁড়ে ছোট্ট একটা মাশরুম গজিয়েছে। এইরকম অসম আকৃতি নিয়ে আমি আর ঢ্যাঙা চললাম। মানে ঢ্যাঙা বেশ খানিকটা এগিয়ে। আমি ইচ্ছাকৃত অনেকটা পিছিয়ে। মানে ভাবটা এমন, মরলে তুই মর। আমি যেন বাঁচার সুযোগ পাই। দেখতে দেখতে দরজার কাছাকাছি এসে পড়েছে ঢ্যাঙা। ও দরজা খুলে বাইরে বেরোনোর সময় চোখ বন্ধ করে নিয়েছি আমি। চোখ বন্ধ করেই শুনতে পাচ্ছি, “তুই কি করছিস এখানে? আমি তো তখনই বুঝেছি। দাঁড়া কাল সকালেই কাকিমাকে বলছি।”
কি হল ব্যাপারটা! তাহলে কি ঢ্যাঙারও বয়ফ্রেন্ড আছে!! কি দুঃসাহসী বয়ফ্রেন্ড। ঢ্যাঙার জন্য বাড়ির লোকজন মানছে না। নিজের প্রাণের তোয়াক্কা করছে না। মাঝরাতে দেখা করতে চলে আসছে। নাহ্ বয়ফ্রেন্ডহীন এ জীবন আমার আর দরকার নেই। এইসব ভাবতে ভাবতে দরজা ঠেলে বেরিয়ে দেখি, পটলা দাঁড়িয়ে আছে। আর ঢ্যাঙা রেগেমেগে পটলার দিকে তাকিয়ে আছে। পটলা!! পটলা এতো রাতে এখানে কি করছে? ওউ কি ঢ্যাঙার বয়ফ্রেন্ড দেখতে এসেছে! কি অবস্থা!! কিন্তু এতো বয়ফ্রেন্ডের মাঝে কেমন একটা পোড়া পোড়া গন্ধ আসছে। তবে কি বয়ফ্রেন্ডটাকে মেরে পুড়িয়ে দিল বাড়ির লোক? ইশ্ সব মিস করে গেলাম আমি! আরেহ্ না কিছু মিস করিনি। ওই তো পটলার পেছন থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
“ঝাঁপ দে পটলা ঝাঁপ দে। তোর পেছনে আগুন লেগেছে।”
কোনো ভাবনা চিন্তা না করে নিজের পেছনের আগুন নেভাতে পটলা ঝাঁপ দিল পাশের আগাছাতে। ওটা এককালে বাগান ছিল। এখন আগাছা সর্বস্ব হয়েছে। কিন্তু কখনো কোনোভাবেই পুকুর হয়ে উঠতে পারেনি। তবুও মানুষ প্রাণে বাঁচতে কতো কিছুই না করে। দিশাহীন পটলাও বেচারা শেষ চেষ্টা করেছিল। আগাছার ওপর পড়েই সে “মাগো গেল, গেল, জ্বলে গেল” বলে চেঁচিয়ে উঠলো। চেঁচামেচিতে ঝন্টিপিসির ছেলে নটে কেঁদে উঠলো। পিসি চেঁচিয়ে উঠলো। মেজো কাকা ছুটে এলো। মনি দাদুও আসতে চাইছে ঘটনাস্থলে। কিন্তু নিজের চশমা খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এসে উঠতে পারছে না। তাই সেটা খুঁজে দেবার জন্য জনে জনে অনুরোধ করে চলেছেন তিনি। কিন্তু বয়ফ্রেন্ডের মাঝে পটলার পেছনে কে আগুন দিল? রহস্য এবং রাত একই সাথে গভীর হচ্ছে।
এদিকে পটলাকে ঝোপ থেকে টেনে তুলে মেজোকাকা জিজ্ঞেস করেই চলেছে, “কিরে এতো রাতে চিৎকার চেঁচামেচি কিসের? তোরা কি বড়ো হবি না!! দেখছিস, দাদার শরীরটা ভালো নেই।…. ব্যাপারটা ঠিক কি বলতো? অ্যাই পটলা তোর হাতে কি? দেখি বের কর।”
পটলা কিছুতেই হাত বের করছে না। মেজো কাকা নিজেই হাতটা টেনে বের করে আনলেন। টানাটানি দেখে মনে হল, হাতটা কোথাও আটকে গেছে। হ্যাঁ, ঠিক তাই। হাতটা বের করে দেখা গেল, পটলার হাতে তখনও পটলারই পশ্চাদ্দেশের চাপে নিভে যাওয়া আধখাওয়া বিড়ির টুকরো। তার মানে আমি বিড়ি পোড়ার গন্ধ পাচ্ছিলাম। এবার বাড়ি ফিরে সিআইডি দেখাটা কমাতে হবে। পটলাকে উদোম মারতে মারতে ঘরে নিয়ে গেল মেজো কাকা। আমরাও যে যার মতো গিয়ে শুয়ে পড়লাম। অবশেষে মনিদাদু এসে পৌঁছতে পেরেছে ঘটনাস্থলে। এসেই তার বিলম্বের কারণ জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে চলেছেন। সঙ্গে ঘটনা জানতে বিকুলি করে চলেছেন। কিন্তু একটু দেরি হয়েছে বলে কেউ তাকে কিছু না বলে শুয়ে পড়লো। শেষে রিনি মনি দাদুকে তার শোবার ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসলো।
পরের দিন সকাল থেকে আমি আর খুব একটা রুমের বাইরে যাইনি। বাকি সব কিছুই মোটামুটি ঠিক চলছিল। শুধু যেদিন ছিলাম ওখানে পটলার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলেই, সে তার চোখ দিয়ে আমাকে টপ্ করে গিলে নিচ্ছে এমন মুখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো, আর আমি ঘাস চিবোনো ছাগলের মতো মুখে পটলার দিকে।
– ঋতুপর্ণা চক্রবর্তী 🍂
