সেই সকাল থেকে বৃষ্টিটা জোড় কদমে হয়ে এইসবে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। আবার কখন শুরু হয়ে যায়। তাই আর দেরি না করে রঙ্গন অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়লো। এই সপ্তাহে বেশ কয়েকটা মিটিং আছে ওদের অফিসে নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে। সাকসেসফুল হলে বিদেশের টেন্ডারটা এবারে তারাই পাবে। তাই বসের কড়া নির্দেশ, নো ছুটি, নো অসুস্থতা। রঙ্গনের মাঝে মাঝে মনে হয়, লোকটা কি পাগল! অসুস্থতা কি আমার কাছে অনুমতি নিয়ে আসবে?
ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। সাথে মাতাল ঝোড়ো হাওয়া। মাঝে মাঝেই চশমার কাঁচে জমা হচ্ছে কুয়াশা। এই বৃষ্টিতে ভাঙা ছাতাটা নিয়ে বেরিয়েও বিশেষ লাভ নেই। রোজই ভাবছে সারাবে, নয় নতুন একটা কিনবে কিন্তু যাওয়াই হচ্ছে না। তাও ভাঙা ছাতাটা হাতে নিল রঙ্গন। মানসিক শান্ত্বনা। কিছু না হোক টুপটাপ বৃষ্টিকে তো সামলাতে পারা যাবে এটা দিয়ে। তুমুল বৃষ্টি হলে না হয় দেখা যাবে……. গলির মুখটুকু পেরোতে না পেরোতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো আবার। ছুটে গিয়ে সামনের একটা দোকানের শেডের তলায় দাঁড়ালো রঙ্গন। সব বৃষ্টি কি এই অফিস টাইমেই হতে হয়! এত্ত তাড়া পৃথিবীতে পড়ার।
না, গতকাল বৃষ্টি পড়েনি। কিন্তু মেঘলা আবহাওয়ায় ঘুমের আমেজ কাটিয়ে ওঠার মতো দুরুহ কাজ করতে রঙ্গনের পৌনে দু ঘণ্টা বেশি সময় লেগেছিল। তাই অগত্যা দেরি। তার আগের দিন কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রথম বাস মিস। অফিস লেট। তার আগের দিন বাস, সময় সবই ঠিক ছিল। কিন্তু ভাগ্যটা সাথে দিল না। টায়ার পাংচার। অগত্যা…..। এখন রঙ্গন দেরি নিয়ে কথা শুনতে শুনতে এতটা অভ্যস্ত করে ফেলেছে নিজেকে যে, দুএকটা দিন সঠিক সময় পৌঁছে গেলে অফিসের বস এবং রঙ্গন দুজনেই দুজনকে দেখে চমকে যায়। বৃষ্টির যা ভাবগতিক তাতে আজ দেরির সম্ভাবনা প্রবল। আজও যদি দেরি হয়ে যায়, বসের কাছে ঘণ্টাখানেকের ঝাড় পাক্কা। লোকটা ঝড়-বাদলা বোঝে না। এমনকি মহামারি, আয়লা, সুনামি, ভূমিকম্প কিছুই বোঝে না। কোন কিছুকেই অফিস লেকের জন্য যথেষ্ট কারণ হিসেবে মনে করে না।
“ধুর! ভাল্লাগেনা…..” আর দু একটা জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছে, কিন্তু এখনো কিছু জানায়নি সেখান থেকে। কাজটা তো সে মন্দ করেনা। তাই দেরি গুলো বসের কাছে এতোটা প্রায়োরিটি পায়না কোনোদিন, সেটা সে ভালোই বোঝে। তবু রোজ দেরি করতে ভালো লাগে না। আসলে বাড়ি থেকে এতোটা দূর….. আবার সবাই কেমন অন্যরকম ভাবে তাকিয়ে থাকবে কিছুক্ষণ। ঐ সময়টুকু রঙ্গনের কাছে বড্ড এম্বারেসিং মনে হয়।
বৃষ্টিটা একটু কমেছে। তবে মাতাল হাওয়ার কমতি নেই। আর সেই ঝোড়ো হাওয়ার কারণে শেডের তলাতে দাঁড়িয়েও রঙ্গনের ফিরোজা রঙের অফিস শার্টের বামপাশ প্রায় পুরোটাই ভিজে গেছে। এমন কাকভেজা হয়ে সারাদিন এরপর এসিতে থাকতে হবে। ভেবেই আরো শীত করছে। টানা এসিতে থাকতে বেশ কষ্ট হয়। নাহ্ আর দাঁড়ানো যাবে না। নয়তো ৮:৫০ এর ট্রেনটাও মিস হয়ে যাবে। হাতের ভাঙা ছাতাটা খুলে সবে দোকানের শেড ছেড়ে অফিসের দিকে রওনা দেবে, এমন সময় হঠাৎ সামনে নীল ওড়নায় এক ঝলক সুখের দেখা। ছিমছাম, ঘননীল আর সবুজ রঙের চুড়িদার পরা একটি মেয়ে। সাদামাটা অথচ একটু কাজলে কি মায়াবী চোখদুটো। বাঙালি মেয়েদের চোখে এক সমুদ্র মায়া বসানো থাকে।…… তারপর, তারপর ……”জ্যায়সে ফিল্মো মে হোতা হ্যায়, হো রাহা হ্যায় হুবহু ” এই মারাত্মক দুর্যোগে ছাতা সামলাতে পারছে না মেয়েটি। কপালে একটা ছোট্ট টিপ। রঙ্গনের কাছে মেয়েটি উপন্যাসের নায়িকার মতো অনুভূত হচ্ছে। চারিদিকের সব গাড়ি ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে তার কাছে। নিজের ভাঙা ছাতাটার কাপড় উড়ে চলে যাচ্ছে, যাক। আকাশের নীল দিয়ে বানাবো আজ ভালোবাসার ছাদ। আশেপাশের শব্দ কোলাহল সব স্তিমিত হয়ে গেল হঠাৎ। শুধু মেয়েটাকেই রঙ্গন ওর ঝাপসা হয়ে আসা চশমাতেও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। রঙ্গনের মনে হচ্ছিল, ঠিক এই কারণেই কবিরা বর্ষায় প্রেম দেখেছেন শুধু। কখনোই রাস্তায় পড়ে থাকা গোবর দেখতে পান নি।
প্রকৃতি এই মুহূর্তটাকে ঢেলে সাজাতে আরো কিছুটা মাতাল করেছে নিজেকে। রঙ্গন দেখছে, মেয়েটার ছাতাটা উলটে গেছে, কোনক্রমে সোজা করার নিষ্ফল চেষ্টা চালাচ্ছে সে। এরম সিন সিনেমায় কতো দেখেছে সে। আজ রঙ্গনের নিজেকে সিনেমার নায়ক মনে হচ্ছে। সামনে নায়িকা, ছাতা সামলাতে পারছে না। ছাতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই মুহূর্তে নায়িকার ওপর হামলা করেছে। নায়ক চশমার কাঁচটা জামার হাতায় মুছে নিয়ে মারাত্মক স্পিডে দৌড়ে নায়িকার কাছে এগিয়ে গেল এবং নায়িকার ছাতা উদ্ধার করলো। মেয়েটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে, একঝলক চোখ দুটো দেখল রঙ্গন।
কিছুক্ষণ আগেও এই বৃষ্টির কারণে কতো বিরক্তি গ্রাস করেছিল তাকে। এখন এই বৃষ্টি সবচাইতে সুন্দর মনে হচ্ছে। আচ্ছা অফিসে লেট, বসের ঝাড়, ঠাণ্ডার ধাত, নতুন চাকরি না পাওয়া, সমস্ত ঝামেলা, সব বিরক্তি, ব্যর্থতাকে অ্যানেসথেটাইজ করতেই কি কেউ পাঠালো এমন এক সুখ এখানে উপন্যাসের নায়িকাকে এখানে, এখনই?…..
মেয়েটা একটু হেসে থ্যাংকস্ জানালো ছোট্ট করে। দুজনেই বেশ ভিজে গেছে ইতিমধ্যে। তাতে কি? সিনেমায় তো এমনি হয়…. রঙ্গন সিনেমার বেড়াজাল কেটে বেরিয়ে আসতে পারছে না, চাইছেও না। সে যেন সিনেমার নামটুকুও ভেবে ফেলেছে, শুধু প্রোডিউসারের অভাবে চুপ করে আছে। রঙ্গনের হাতে ছাতা নেই দেখে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, “আপনার ছাতা আছে? আমি এগিয়ে দিতে পারি।” কিছু না বলে, পিছনে একবার তাকাল। কাপড় বিহীন ছাতাটা রাস্তায় উল্টে পড়ে আছে। এই ছাতাটার প্রতি রঙ্গনের এতো প্রেম, শ্রদ্ধা, ভক্তি যে কোনোদিনও ছিল তা সে নিজেও আজকের আগে জানতে পারেনি। সামনে ঘুরে উত্তরে “না, নেই” বলে, মেয়েটির ছাতার আরেকটু নিচে সরে এসে, ছাতার হাতলটা ধরল রঙ্গন। মেয়েটাও ধরে আছে। দুজনে একসাথে সামনের দিকে হাঁটা দিল। আজ দিক বস বকা, লাগুক আজ এসিতে ঠাণ্ডা, জাস্ট কিচ্ছু যায় আসে না। কিচ্ছু কিচ্ছু কিচ্ছু না। হঠাৎ রঙ্গনের মনে হল, বৃষ্টি ব্যাপারটা অতোটাও বিরক্তির নয়। চারিদিকের গাড়ির গতি আবার বেড়ে গেছে, পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে চারিদিক।আশেপাশের লোকেদের কথা আবার আগের মতই শোনা যাচ্ছে। আবার বৃষ্টি নামুক পৃথিবীর বুকে। আকাশ ভেঙে কালো মেঘের দল আসুক আজ আবার। হাতে হাত ঠেকে যায়। দুচোখে আরো এক জোড়া চোখ আবদ্ধ হোক…… আজ ইচ্ছে করছে বলতে ভীষণ, আমার অনুভূতিরা, তোমার ঘরে নেমে আসুক। আমার তুমুল আবেগ, তোমার বুকের জমিন তীব্রভাবে স্পর্শ করুক………🌼💦
